
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ‘জনপ্রত্যাশার ইশতেহার’ শিরোনামে প্রকাশিত এ ইশতেহারে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বস্তরে শরীয়াহ’র প্রাধান্য, রাজনীতিতে গুণগত সংস্কার এবং সাম্য ও মানবিক মর্যাদাভিত্তিক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার করা হয়েছে।
দলটি জানিয়েছে, আগামী ১৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত ও কল্যাণরাষ্ট্রে রূপান্তর করার লক্ষ্য নিয়ে এই ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে নীতিগত অবস্থান, রাষ্ট্র সংস্কার এবং খাতভিত্তিক উন্নয়ন—এই তিন স্তরে পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।
ইশতেহারে বলা হয়, রাষ্ট্র গঠনে নৈতিকতা ও প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিক সেবা নিশ্চিত করাই তাদের মূল অঙ্গীকার। একই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলামী শরীয়াহ’র কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তিন অধ্যায়ে ইশতেহার:
ইশতেহারটি তিনটি অধ্যায়ে উপস্থাপন করা হয়েছে—
১) রাষ্ট্র গঠনে নীতিগত অবস্থান
২) রাষ্ট্র সংস্কারের পরিকল্পনা
৩) খাতভিত্তিক উন্নয়ন কর্মসূচি
‘মৌলিক ইশতেহার’ অংশে মোট ৩১টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রাষ্ট্র পরিচালনায় শরীয়াহ’র প্রাধান্য, রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন, সাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ১৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্য। পাশাপাশি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্র গঠনে নীতিগত অবস্থান:
রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিগত কাঠামোতে ৮টি দফা ঘোষণা করেছে দলটি। এসব দফার মধ্যে রয়েছে ইসলামের মৌলিক নীতিমালা অনুসরণ, ক্ষমতা হস্তান্তরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বজায় রাখা, সকল ধর্ম ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণ, সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা।
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাব:
রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে ইশতেহারে ৬টি প্রধান প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি চালু, রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, দক্ষ ও সৎ জনপ্রশাসন গঠন এবং স্বনির্ভর ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
বিশেষ কর্মসূচি:
প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও জরুরি নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে ১২ দফা বিশেষ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এতে হতদরিদ্রদের জন্য মাসিক ৫ হাজার টাকা নগদ সহায়তা, ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের জন্য সুদমুক্ত ও জামানতবিহীন এককালীন ঋণ, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিদিন পুষ্টিকর খাবার এবং সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্ড ও কৃষিকার্ড চালুর প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
খাতভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা:
দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য ২৮টি খাতভিত্তিক পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে ইশতেহারে। এর মধ্যে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মমুখী বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা, সার্বজনীন কর্মসংস্থান, প্রবাসী কল্যাণ, আঞ্চলিক উন্নয়ন ভারসাম্য, পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষা অন্যতম।
ইশতেহারে নারী, শিশু, সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শরীয়াহ অনুযায়ী নারীর সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা, কর্মজীবী মায়েদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন এবং নারীর প্রতি সহিংসতা ও ধর্ষণের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া পররাষ্ট্র নীতিতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার ভিত্তিতে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় স্থল, নৌ ও আকাশ বাহিনী নিয়ে একটি শক্তিশালী ও স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে ইশতেহারে।
সামগ্রিকভাবে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এই ইশতেহারের মাধ্যমে একটি দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক ও ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা তুলে ধরেছে।