
নরসিংদী প্রতিনিধি: দেশে নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পর প্রশাসন সংস্কার নিয়ে যখন নানা মহলে আলোচনা চলছে, ঠিক সেই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক শক্তিশালী ও হৃদয়গ্রাহী বক্তব্য দিয়ে ব্যাপক আলোচনায় এসেছেন নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শামীম আনোয়ার।
গতকাল নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে তিনি নাগরিকবান্ধব রাষ্ট্র গড়তে সর্বাগ্রে দুর্নীতিমুক্ত পুলিশ বাহিনী প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। পোস্টটি প্রকাশের পর থেকেই তা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং ইতোমধ্যে ভাইরাল হয়েছে।
বর্তমানে নরসিংদীর সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শামীম আনোয়ার তার লেখায় বলেন, “জনহয়রানিমুক্ত ও নাগরিকবান্ধব প্রশাসন গড়ে তুলতে হলে প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত পুলিশ বাহিনী।”
তিনি উল্লেখ করেন, ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’—এই বহুল প্রচলিত স্লোগানকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে পুলিশের প্রতি দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস ও সন্দেহ দূর করতে হবে। প্রতিটি পুলিশ সদস্যকে সমাজে বিশ্বাস, সম্মান ও শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তার মতে, দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষই চরম অসহায় অবস্থায় পুলিশের দ্বারস্থ হন। বিত্তবান বা ক্ষমতাবানরা বিকল্প উপায়ে সমস্যার সমাধান করতে পারলেও সাধারণ মানুষই থানাপুলিশের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই শ্রেণির মানুষের কাছ থেকে অল্প পরিমাণ ঘুষ আদায়ও নৈতিকতার বিচারে ভয়াবহ অন্যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পোস্টে তিনি আরও বলেন, জনসংখ্যার সিংহভাগ মানুষ যদি তাদের বিপদের মুহূর্তে পুলিশের কাছে গিয়ে হয়রানি বা অনৈতিক আচরণের শিকার হন, তবে রাষ্ট্রের প্রতি সামগ্রিক আস্থা ক্ষুণ্ণ হয়। এতে করে সরকারের অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও মানুষের কাছে গুরুত্ব হারায়।
দুর্নীতি ছাড়াও পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগ— যেমন মামলা ও জিডি গ্রহণে অনীহা, তদন্তে পক্ষপাত, রূঢ় আচরণ বা অবৈধ নির্দেশ পালন—এসবের মূলে আর্থিক স্বার্থ জড়িত বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষায়, “মূল রোগ দুর্নীতিকে বিদায় করা গেলে অন্যান্য উপসর্গ আপনাতেই দূর হয়ে যাবে।”
নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ের সূচনা হোক পুলিশ বাহিনী থেকেই। এতে অসাধু কিছু ব্যক্তি অসন্তুষ্ট হতে পারেন, কিন্তু সৎ ও পেশাদার পুলিশ সদস্য এবং সাধারণ জনগণ উপকৃত হবেন।
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, বাহিনীর যে সদস্যই দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত থাকুক না কেন, তাদের খুঁজে বের করে বাহিনী থেকে অপসারণ ও বিচারের মুখোমুখি করার বিকল্প নেই।
নিজের লেখার শেষাংশে শামীম আনোয়ার আবেগঘন ভাষায় উল্লেখ করেন, “যে ইউনিফর্ম আমার সম্মানের প্রতীক, সেই পবিত্র ইউনিফর্মকে যারা কলুষিত করেছে, তাদের স্থান বাহিনীতে নয়—বিচারালয়ে হোক।”
তার এই স্পষ্ট অবস্থান ও আত্মসমালোচনামূলক বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা কুড়াচ্ছে। অনেকেই মন্তব্য করেছেন, পুলিশের ভেতর থেকেই এ ধরনের সাহসী উচ্চারণ পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
প্রসঙ্গত, প্রশাসন সংস্কার ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নিয়ে দেশজুড়ে যখন আলোচনা তুঙ্গে, তখন একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তার এমন প্রকাশ্য অবস্থানকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।