1. admin@narsingdirkanthosor.com : admin :
সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:০৮ পূর্বাহ্ন

পাঁচদোনায় ৭ বছরেও উন্মুক্ত হয়নি গিরিশচন্দ্র সেন যাদুঘর

সুজন বর্মণ | নিজস্ব প্রতিবেদক :
  • প্রকাশিতঃ বুধবার, ১৭ আগস্ট, ২০২২
  • ৩০৬ বার

সুজন বর্মণ, নিজস্ব প্রতিবেদক : উদ্যোগ নেয়ার দীর্ঘ ৭ বছরেও দর্শানার্থীদের জন্য উন্মুক্ত হয়নি পবিত্র কোরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদক ভাই গিরিশচন্দ্র সেন যাদুঘর। প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে তার পৈত্রিকা বাড়ি নরসিংদীর পাঁচদোনায় নির্মাণ কাজটি চলমান থাকলেও প্রয়োজনী বরাদ্ধের অভাবে শেষ সময় নির্ধারণ হয়নি। ১৫ আগস্ট সোমবার ভাই গিরিশ চন্দ্র সনের ১১২তম প্রয়াণ দিবস ছিল। দিবসটি পালনে স্থানীয় প্রশাসন এমনকি কোনো সংগঠনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ।

১৮৩৪ সালে নরসিংদী সদর উপজেলার পাচঁদোনা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ভাই গিরীশ চন্দ্র সেন। হিন্দু পরিবারে জন্ম হলেও তার সুনাম-সুখ্যাতির কেন্দ্র বিন্দু ছিল আরবি-ফার্সি ভাষার পান্ডিত্য জ্ঞান। ১৮৭১ সালে গিরিশ চন্দ্র সেন সনাতন ধর্ম ত্যাগ করে ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করেন। ১৮৭৬ সালে ৪২ বছর বয়সে তিনি মৌলভী এহসান আলীর কাছে আরবি ব্যাকরণ শেখেন। ৩ বছর কঠোর সাধনার পর ব্রিটিশ ভারতের অবিভক্ত বাংলায় গিরিশ চন্দ্র সেনই সর্বপ্রথম ১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দে পবিত্র কোরআন শরীফের প্রথম পারা বাংলা অনুবাদ করেন যা শেরপুর চারু চন্দ্র প্রেস থেকে ছাপা হয়। পরবর্তী ৬ বছর কঠোর পরিশ্রম করে সম্পূর্ণ কোরআন শরীফের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করে বিশ্ববাসীকে চমৎকৃত করেন। তিনি তার প্রকাশিত ৩৫টি গ্রন্থের মধ্যে ২২টি ইসলাম ধর্ম বিষয়ক।

ভাই গিরীশ চন্দ্র সেন ১৯১০ সালের ১৫ আগস্ট শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলে নরসিংদীর পাঁচদোনা গ্রামের বাড়ীতে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। অথচ এ মহান ব্যক্তির স্মৃতি বিজড়িত পাঁচদোনার এই বাড়ীটি সংরক্ষণ তো দূরের কথা, উল্টো বেদখলে চলে গেছে তার ভিটে-বাড়ি। নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে তার শেষকৃত্য স্থানটিও। দেশের দূর দূরান্ত থেকে লোকজন গিরীশ চন্দ্রের বাড়ী দেখার জন্য ছুটে আসলেও হতাশ হয়ে ফিরে যেতেন একটা সময়ে।

অযত্নে অবহেলায় পরে থাকা প্রখ্যাত এই মহামানবের একমাত্র তার স্মৃতিচিহ্ন বাড়িটি পত্নতত্ত্ব বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসন মিলে ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনের বাড়িটিকে যাদুঘরে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়। ২০০৮ সালে বাড়িটির মূল কাঠামো অক্ষুন্ন রেখে সংস্কারে অনুদান দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে ভারতীয় হাইকমিশন। পরে ২০১৫ সালে নরসিংদী জেলা প্রশাসন ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা কেন্দ্র ঐতিহ্য অন্বেষণের মধ্যে ১ কোটি ২০ লাখ টাকায় বাড়িটি সংরক্ষণ ও একটি প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর নির্মাণের চুক্তি হয়।

সরকারের নিয়ন্ত্রণে ও দিক নির্দেশনায় ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চালু হলেও নির্মাণ কাজ বাকী থাকায় পুরোদমে চালু হচ্ছেনা যাদুঘরটি। এটি পুরোদমে চালু হলে উন্মুক্ত হবে উপ-মহাদেশের প্রখ্যাত এই মানুষটি সম্পর্কে জ্ঞান-ধারণা। লোকবল না থাকায় ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনের বাড়ি যাদুঘরটি সপ্তাহে শনিবার ব্যতিত খোলা রাখাও সম্ভব হচ্ছেনা। ঠিক ভাবে প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় গিরিশচন্দ্র সেনের বাড়ি জুড়ে এখন ময়লার ভাগাড়।

স্থানীয় বাসিন্দা সুদীর রায় বলেন, জ্ঞানের যে কোন সীমা নেই তা গিরিশ চন্দ্র সেন থেকে শিক্ষা নেয়া যায়। তিনি হিন্দু হয়েও আরবি-ফার্সি ভাষার পান্ডিত্য ছিলেন। যার ফলেই তিনি পবিত্র কোরআনের বাংলা অনুবাদ করতে পেরেছেন। আমরা বইয়ের মধ্যে গিরিশ চন্দ্র সম্পর্কে জানলেও এই মহামানবের জন্মস্থান অবহেলায় পড়ে রয়েছে। সরকার যাদুঘরের উদ্যোগ নেয়ার ফলে আমরা আশাবাদী ছিলাম তার ব্যবহ্নত জিনিসপত্র ও লেখা সমূহ থেকে তরুণ প্রজন্ম জ্ঞান আহরণ করতে পারবে। কিন্তু যাদুঘরের কাজ ত শেষই হলো না এখন বরং জাদুঘর খোলারই লোক নেই।

আরেক বাসিন্দা অচিন্ত্য পাল বলেন, যাদুঘর বেশির ভাগ সময় বন্ধই থাকে। মানুষ ঘুরতে এসে বন্ধ দেখেই চলে যায়। অযতœ আর অবহেলায় যাদুঘরের আশপাশে ময়লার ভাগাড় জমেছে। একটি ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানের সাথে এখানকার পরিবেশ দেখে আমাদের হতাশা হতে হয়। আমরা চাই গিরিশ চন্দ্র সেনের কীর্তি গুলো মানুষ শিখে তা তাদের নিজের জীবনে প্রয়োগ করে মানুষের কল্যাণে কাজ করবে।

আরেক বাসিন্দা কমল হাসান বলেন, সেন বংশের প্রচুর জায়গা সম্পত্তি ছিলো। কালের পরিক্রমায় তা আজ সবই বেদখলে চলে গেছে। যাদুঘরের জন্য নির্ধারিত জায়গা ও এখন বেদখলে। আমরা চাই জাদুঘরের কাজ সম্পূর্ণ ভাবে শেষ করে এটাকে দর্শণীয় স্থান হিসেবে গড়ে তোলার। যার ফলে নতুন প্রজন্ম ও কোমল মতি শিশুরা এখানে ঘুরতে এসে এই মহামানবের কীর্তি সম্পর্কে জানতে পারে।

মাধবদীর ভাই গিরিশচন্দ্র সেন গণপাঠাগারের সভাপতি শাহীনুর মিয়া বলেন, পবিত্র কোরআন শরিফের অনুবাদ করে ভাই গিরিশ চন্দ্র সেন শুধু নরসিংদী বা বাংলাদেশে নয়, সমগ্র উপমহাদেশেই একটি অতি পরিচিত নাম। তবে বর্তমান প্রজন্মরা জানেনা গিরিশ চন্দ্র সম্পর্কে। তেমনি স্থানীয় লোকজনও ভূলতে বসেছেন গিরিশ সেনের ইতিহাস। দেশের দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরা এই মহামানবের স্মৃতি বিজরিত স্থান দেখতে এসে হতাশ হয়ে ফিরে যায়। আমরা চাই দ্রুত সময়ের মধ্যে যাদুঘরের সংস্কার কাজ শেষ করে যেনো সাধারণ মানুষের জন্য খোলে দেয়া হয়। আর ভাই গিরিশ চন্দ্র সনের ১১২তম প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে আমরা পাঠাগারের সদস্যদের নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করলেও স্থানীয় প্রশাসন থেকে কোন উদ্যোগ নেই, যা দুঃখজনক।

নরসিংদী জেলা প্রশাসক আবু নইম মোহাম্মদ মারুফ খান বলেন, প্রত্নতত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক গিরিশচন্দ্র সেনের বাড়িটি সংস্কার কাজ করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে ঐতিহ্য অন্বেষণ কাজ শেষ করলেও জাদুঘরের কাজ আরো বাকি রয়েছে। অচিরেই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দ্বিতীয় দফায় বরাদ্ধ প্রাপ্তির ভিত্তিতে কাজ সম্পন্ন করা হবে। এরপরই সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে যাদুঘরটি। সেই সাথে বাড়িটি ঘিরে অবৈধ স্থাপনাও উচ্ছেদে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

নিউজ কপিরাইট /নরসিংদীর কন্ঠস্বর/স.সা.হো./

আরো খবর..
© নরসিংদীর কন্ঠস্বর
Developed By Bongshai IT