সাব্বির হোসেন, নিজস্ব প্রতিবেদক : দরজায় কড়া নাড়ছে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩। আর এই নববর্ষকে রাঙিয়ে তোলে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা। সেই মেলাকে কেন্দ্র করে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন নরসিংদীর পলাশ উপজেলার মৃৎশিল্পীরা
১৪ এপ্রিল বাঙালির প্রাণের উৎসব শুভ নববর্ষ। নববর্ষের এই উৎসবটিকে ঘিরে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বসে বর্ষবরণ মেলা। সেই মেলায় চাহিদা থাকে নানা রকমের খেলনা, মাটির জিনিসপত্রের। আর মেলাকে দৃষ্টিনন্দিত করতে মৃৎশিল্পীরা নিজের হাতে নিপুণ কারুকাজে মাটি দিয়ে তৈরি করেন শিশুদের জন্য রকমারি পুতুল, ফুলদানি, রকমারি ফল, হাড়ি, কড়াই, ব্যাংক, বাসন, থালা, বাটি, হাতি, ঘোড়া, বাঘ, টিয়া, ময়না, ময়ূর, মোরগ, খরগোশ, হাঁস, কলস, ঘটি, মুড়িভাজার ঝাঞ্জুর, চুলা ও ফুলের টবসহ বিভিন্ন মাটির জিনিসপত্র। তবে আধুনিক প্লাস্টিক, মেলামাইন ও স্টিলের পণ্যের দাপটে দুই শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। তবুও ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন স্থানীয় কারিগররা।
উপজেলার ঘোড়াশাল পৌর এলাকার কুমারটেক, পাল পাড়া, টেঙ্গরপাড়ার গ্রামগুলোতে মৃৎশিল্পের সাথে জড়িত রয়েছে শতাধিক পরিবার। তারা বিভিন্ন উৎসবে মাটির তৈরির জিনিসপত্র তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। বাংলা নববর্ষ বরণে জেলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের মেলায় অধিকাংশ মাটির সামগ্রী সরবরাহ করে থাকেন এই উপজেলার এসব মৃৎশিল্পিরা। তাই এখানে পুরুষ মৃৎশিল্পীর পাশাপাশি নারী মৃৎশিল্পীরাও সমানতালে কাজ করে যাচ্ছেন।
তার মধ্যে উপজেলার টেংগড় পাড়া গ্রামে বসবাসরত প্রায় ২০টি পাল পরিবার। বৈশাখী মেলা উপলক্ষে নারী মৃৎশিল্পীরা নিজের হাতে নিপুণ কারুকাজে মাটি দিয়ে তৈরি করেছেন শিশুদের নানান রকমের খেলনা। তারা এখন ওই খেলনা তৈরি করছেন দিন,কিংবা নির্ঘুম রাতব্যাপিও। ইতোমধ্যে খেলনাগুলোকে দৃষ্টিনন্দিত করতে বিভিন্ন রং দিয়ে সাজানোর কাজ চলছে বলেও জানান, এখানকার শিল্পীরা।
এখানকার মৃৎশিল্পীরা জানান, পারিবারিকভাবেই তারা পৈত্রিক পেশা হিসেবে এই মাটির কাজ ধরে রেখেছে। পণ্যের রং ও নকশার কাজ নিজেরাই করে থাকে। খেলনা তৈরির জন্য মাঠ থেকে মাটি আনা, মাটি নরম করা, সাঁচ বসানো, চুলায় পোড়ানো, রোদে শুকানো, রং করাসহ প্রায় সব কাজই এখানকার নারীরা করেন। আসছে বৈশাখী মেলাকে সামনে রেখে এক একটি পরিবার প্রায় ২ হাজার খেলনাসহ মাটির জিনিসপত্র তৈরি করেছেন এবং রঙের কাজও প্রায় শেষ করা হয়েছে। বাঙালির ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের একসময় বিপুল কদর থাকলেও বছরের অন্যান্য দিনে তারা বেশ দূর অবস্থায় থাকেন। শুধু মেলা এলেই কেবল কর্মমুখর হয়ে ওঠে চিরচেনা ঐতিহ্যময় প্রাচীন এই মৃৎ শিল্পীসমৃদ্ধ পাল পাড়া গ্রাম। পহেলা বৈশাখের আগে খানিকটা সময়ের জন্য হলেও মৃৎশিল্প তার হৃতগৌরব ফিরে পায় এবং মৃৎশিল্পীরাও ব্যস্ত হয়ে ওঠেন নানা সামগ্রী তৈরিতে। কিন্তু বছরের অন্যান্য দিন গুলো মানবেতর জীবন-যাপন করেন এই মৃৎশিল্পীরা।
মৃৎশিল্পী দেবিন্দ্র চন্দ্র পাল, নারায়ণ চন্দ্র পাল, জয়কৃঞ্জ পাল ও দিপালী চন্দ্র পালের সাথে কথা বললে তারা বলেন, এ যুগে বেশি মূল্যে এসব জিনিস কিনতে আগ্রহ দেখান না ক্রেতারা। এতে আমাদের লোকসান গুনতে হয়। বাংলা নববর্ষ বরণে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের বিপুল কদর থাকলেও বছরের অন্যান্য দিনে তারা বেশ দূর অবস্থায় মানবেতর জীবন-যাপন করেন।
নিপেন্দ্র চন্দ্র পাল ও ফনিন্দ্র চন্দ্র পাল নামে দুই মৃৎশিল্পী জানান, “আগে আমাদের তৈরি জিনিসের খুব চাহিদা ছিল। এখন প্লাস্টিক আর স্টিলের জিনিস বাজার দখল করে নিয়েছে। আমাদের পণ্য বিক্রি হয় না, সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে তাই আমাদের সন্তানরা মাটির কাজ শিখতে চায় না। তারা অন্য পেশায় নিযুক্ত হচ্ছে। আমরা যারা আছি,তারা অন্য কোনো কাজ না জানার কারণে লেগে আছি। অনেক কষ্ট করে খেয়ে না খেয়ে কোনো রকম দিন কাটাচ্ছি। আমাদের খোঁজ-খবর কেউ নেয় না। পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশিক্ষণ পাওয়া গেলে খেলনা, শোপিসসহ অন্যান্য সৌখিন জিনিস তৈরি করে শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব বলে মনে করেন মৃৎশিল্পীরা।
প্রধান উপদেষ্টা: মো: আশাদউল্লাহ মনা
সম্পাদক: সাব্বির হোসেন
ঘোড়াশাল,পলাশ,নরসিংদী, বাংলাদেশ।
যোগাযোগ: +৮৮০১৭১৫৪০৮৩৪০
নরসিংদীর কন্ঠস্বর @২০২৬