মণ্ডপের দেয়ালে শিল্পকর্মে বাবার আত্মত্যাগের গল্প নরসিংদী শহরের মধ্যকান্দাপাড়ার মণ্ডপে বাঘবিতান ক্লাবের ব্যতিক্রমী আয়োজন। সোমবার তোলা। ছবি: সংগৃহীত
দেয়ালজুড়ে ব্যবসা, আইন, চিকিৎসা, প্রকৌশল, সাধারণ চাকরি, সাংবাদিকতা- এমন নানা পেশায় নিয়োজিত বাবার জীবনসংগ্রাম, সন্তানের জন্য নিরন্তর ছুটে চলার ছবি।
পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফোটাতে যে বাবা নিজের সুখ বিসর্জন দেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে নীরবে বয়ে চলেন দায়িত্বের ভার- সেই বাবার ঘাম, শ্রম, ত্যাগ আর ভালোবাসার গল্প উঠে এসেছে এবারের দুর্গাপূজার মণ্ডপে।
নরসিংদী শহরের মধ্যকান্দাপাড়ার বাঘবিতান ক্লাবের ব্যতিক্রমী এই আয়োজন দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরেছে বাবার জীবনের অন্যরকম প্রতিচ্ছবি।
বাঘবিতান ক্লাবের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এবারের দুর্গাপূজার থিম ‘অর্ধশতকের প্রণাম—বাবা’। কঠিন পদার্থে শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাঠামোয় সাজানো হয়েছে মণ্ডপ। পুরনো ধাতুর ক্ষয়, লোহার কাঠামোর দৃঢ়তায় নানা শিল্পকর্মের মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বাবার জীবনের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের গল্প।
পূজা সাহা নামের এক দর্শনার্থীর ভাষ্য, পূজার আনন্দ উপভোগের পাশাপাশি আমরা উপলব্ধি করছি পরিবারের জন্য বাবার নীরব আত্মত্যাগ। এটা দেখে আমার চোখে জল এসে পড়েছে। সত্যিই, প্রত্যেক পরিবারে বাবারা অনেক কষ্ট করে।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থেকে আসা দর্শানার্থী সজল রায় বলেন, নরসিংদীর পূজা সবসময় জাকজমক ও দৃষ্টিনন্দন হয়।
পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে পূজায় ঘুরছি আর আনন্দ করছি। শিক্ষণীয় থিমে মণ্ডপ সাজানোয় ছেলেমেয়েরা আনন্দের পাশাপাশি শিক্ষাও পাচ্ছে।
বাঘবিতান ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ সুদীপ্ত কুমার সাহা বলেন, প্রতিবারই আমরা থিমভিত্তিক পূজার আয়োজন করি। এবার ক্লাবের ৫০ বর্ষ উদযাপনে বেছে নেওয়া হয়েছে সংসারে বাবার আত্মত্যাগের গল্প। তিন মাস পরিশ্রম করে শ্রমিকরা তা ফুটিয়ে তুলেছেন।
বাবার আত্মত্যাগের গল্পের পাশাপাশি এবারের দুর্গাপূজায় নরসিংদী শহরের বিভিন্ন মণ্ডপে উঠে এসেছে কৃষি, পুরাণ, প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যের নানা অনুষঙ্গ। কোথাও দেবী দুর্গার প্রতিমায় কৃষকের রূপ, কোথাও ভগবান বিষ্ণুর দশ অবতার; কোথাও আবার প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা কিংবা অযোধ্যার স্থাপত্যশৈলী।
বৈচিত্র্যময় এসব আয়োজন দেখতে প্রতিদিনই নানা বয়সী মানুষের ভিড় জমছে মণ্ডপগুলোতে। শহরের অগ্রণী সংঘ এবারের থিমে তুলে ধরেছে কৃষি ও কৃষকের অবদান। মণ্ডপে দেবী দুর্গাকে কৃষকের রূপে উপস্থাপনের পাশাপাশি টেরাকোটার মাধ্যমে বাংলাদেশের জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতিতে কৃষকের ভূমিকা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
অগ্রণী সংঘের সাধারণ সম্পাদক সুব্রত কুমার সাহা বলেন, ‘আমাদের দেশ কৃষিপ্রধান। আমাদের জীবনে কৃষকের গুরুত্ব অনেক। তাই মা দুর্গাকে কৃষক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আমরা এই পূজায় কৃষকের গুরুত্ব ও ভূমিকা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
অন্যদিকে, শহরের দেবাঙ্গন মন্দিরের মণ্ডপ সাজানো হয়েছে ভগবান বিষ্ণুর দশ অবতার ঘিরে। প্রতিমা, নিখুঁত শিল্পকর্ম ও আলোকসজ্জায় পুরানের দশ অবতারকে তুলে ধরা হয়েছে। সেবা সংঘের মণ্ডপে রয়েছে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা ও ফারাওদের স্থাপত্যের অনুপ্রেরণা। আর শীতলা বাড়ির মণ্ডপে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ভারতের প্রাচীন অযোধ্যা মন্দিরের আদল।
নরসিংদীর পূজামণ্ডপে শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও দর্শনার্থীরারা রাতভর পূজা দেখতে আসছে। মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে প্রতিমা দর্শন, আলোকসজ্জা উপভোগ ও ছবি তোলায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। তবে উৎসবের ভিড়ে বাবার আত্মত্যাগ কিংবা কৃষকের অবদানের মতো বিষয়গুলো মণ্ডপের শিল্পকর্মে উঠে আসায় আয়োজনগুলো পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
হবিগঞ্জ থেকে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী পার্বতী দে বলেন, নরসিংদীর পূজা কয়েক বছর ধরে থিম নির্ভর হয়ে উঠেছে। তাই পূজায় ঘোরার তালিকায় নরসিংদী বাদ যায় না। এবারও দৃষ্টিনন্দন সাজে পূজা হচ্ছে এখানে।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর নরসিংদী জেলায় মোট ৩৬৯টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া শারদীয় দুর্গোৎসব শেষ হবে ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে।
প্রধান উপদেষ্টা: মো: আশাদউল্লাহ মনা
সম্পাদক: সাব্বির হোসেন
ঘোড়াশাল,পলাশ,নরসিংদী, বাংলাদেশ।
যোগাযোগ: +৮৮০১৭১৫৪০৮৩৪০
নরসিংদীর কন্ঠস্বর @২০২৬